মির্জা ফখরুল

গাজীপুরের নির্বাচন:

গাজীপুরের সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন শেষ হয়েছে কোন রকম ঝামেলা ছাড়াই। অনেকে অনেক রকম আশঙ্কার কথা বলেছিল কিন্তু তার কোনটাই সত্য প্রমানিত হয়নি। বিরোধী দলের দাবী ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া দেশে নির্বাচন সুষ্ঠ হবেনা। কিন্তু কোনরকম দুর্নীতি বা অস্বচ্ছতার খবর পাওয়া যায়নি। সরকারী দলের হেভি ওয়েট প্রার্থী পরাজিত হয়েছে একজন স্বতন্ত্র প্রার্থীর কাছে (আসল প্রার্থীটি ছিল জাহাঙ্গীর)। নির্বাচনোত্তর কোন সহিংসতার ঘটেনা ঘটেনি কোথাও। নির্বাচন কমিশনকে নিয়ে যারা বিরূপ মন্তব্য করেছে তাদের সেই অনুমান সত্য প্রমানিত হয়নি। গাজীপুরে একটি স্বচ্ছ নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। নির্বাচন কমিশন তাদের দক্ষতার প্রমান দিয়েছে। জাহাঙ্গীরের মা পরাজিত হলে নির্বাচনোত্তর গাজীপুর কেমন হত তা এখন আর ভাবনায় না আনাই শ্রেয়।

নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর পরাজয় হলেও বিজয় হয়েছে গনতন্ত্রের। গাজীপুরবাসী তাদের পছন্দের মেয়র নির্বাচন করেছে স্বাধীনভাবে ভোট দিয়ে। ভালমন্দ বিবেচ্য নয় মানুষ গনতন্ত্র চর্চার সুযোগ পেয়েছে। বিরোধী দল যেভাবে দেশে গনতন্ত্র নেই বলে আন্দোলন সংগ্রাম করে চলেছে তা আসলে মিথ্যাচার-সেটাই প্রমান করেছে গাজীপুরের নির্বাচন।

এই নির্বাচন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ কেও মেসেজ দিয়েছে। যোগ্য ব্যক্তিকে প্রার্থী করা হলেও স্থানীয় নেতারা দলের সিদ্ধান্ত পালটে দিতে পারে। জাতীয় নির্বাচনের চিত্রটি কেমন হবে বলা মুশকিল। তবে গাজীপুর দলকে একটি মেসেজ দিয়েছে। কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ তা বুঝেছেন বলেই মনে করা ভাল। আওয়ামী লীগের কোন প্রতিপক্ষ নেই, দলের নেতারাই আওয়ামী লীগের প্রতিপক্ষ। দেশের ৩০০ টি নির্বাচনী আসনেই একাধিক প্রার্থী প্রস্তুত হয়ে রয়েছে। নির্বাচনের জন্য গনসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছে নিজেদের মত করে। দলের মনোনয়ন না পেলে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েই দলের বিরুদ্ধে লড়বে বিদ্রোহীরা। নিজেরাই নিজেদের ভোট কাটাকাটি করে তৃতীয় পক্ষকে জয়ী করে দিবে। এবার আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেতে চাইবে ইতিহাসের সব চাইতে বেশী সংখ্যক প্রার্থী কারন-

(১) নির্বাচন করে সরকার গঠনের মত আর কোন দল এখন বাংলাদেশে নেই।

(২) কিছু নব্য নেতা অনৈতিকভাবে বিশাল অর্থ সম্পদের মালিক বনে গেছে (সব সরকারের আমলেই এরা ক্ষমতার ঘনিষ্ঠে থাকে)।

(৩) এলাকায় কেন্দ্রের নির্দেশ অমান্য করে পছন্দের নেতা নির্বাচিত করেছেন স্থানীয় নেতারা, ত্যাগী কর্মীরা অবহেলিত হয়েছে সবখানে।

(৪) অনেকের বয়স ফুরিয়ে যাচ্ছে আর সুযোগ না’ও পেতে পারে এবং-

(৫) সবারই ধারনা অনেক টাকা খরচ করে হলেও আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেলেই নৌকার জোরে এম পি হয়ে যাবে!

এসব কারনে এখন বি এন পি’র নেতারাও কেউ কেউ তদবির চালাচ্ছে আওয়ামী লীগে যোগ দিতে। তাদের একটাই দাবী মনোনয়ন নিশ্চিত করতে হবে! নিশ্চয়তা পেলে দল ছুট নেতাদের হিড়িক পরে যাবে মনোনয়ন দৌড়ে। এই প্রক্রিয়ায় বি এন পি’র কেন্দ্রীয় নেতারাও রয়েছেন কয়েকজন।
গাজীপুরের নির্বাচন বিদেশী মোড়লদেরও মেসেজ দিয়েছে। কথায় কথায় নির্বাচনের স্বচ্ছতার কথা বলে যারা বিধিনিষেধ জারি করে তাদের মুখটিও বন্ধ হয়ে গেছে। এখন বরং তাদের নির্বাচনে পর্যবেক্ষক পাঠানোর সময় এসেছে। আর যারা কূটনৈতিক পাড়ায় গিয়ে গোপন বৈঠক করে (!) দেশের সুনাম বিনষ্ট করে নালিশ করে, তাদেরও এখন মুখে আঠা লেগে গেছে।

সুশীল সমাজখ্যাত লোকেরা দেশে রাজনীতি শুদ্ধিকরনের দাবী করে আসছে বহুদিন ধরে। তাদেরকেও মেসেজ দিয়েছে গাজীপুরের নির্বাচন। ভোটের হিসাব শুধুমাত্র যোগ্যতায় বিবেচিত হয়না। প্রভাবশালী অযোগ্যকেও ভোট দেয় শিক্ষিত মানুষেরা। অবশ্য এর জন্য একজন প্রভাবশালী ছেলে দরকার (জাহাঙ্গীরের মত)। এই নির্বাচনে কার কি হয়েছে জানিনা তবে বহু রাজনৈতিক প্রশ্নের উত্তর মিলেছে গাজীপুরে।


আজিজুর রহমান প্রিন্স, কলামিস্ট ও আওয়ামীলীগ নেতা, টরন্টো, কানাডা


by

Tags: