ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারালো রাজু

ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধিঃ ঠাকুরগাঁও জেলার পীরগঞ্জ উপজেলায় শুক্রবার (২৩ সেপ্টেম্বর) দুপুরে ৩ জন মোটরসাইকেল আরোহী নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গাছের সঙ্গে ধাক্কা লেগে সড়ক দুর্ঘটনায় আরোহী রাজু ইসলাম (৪০) নামের একজন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আবুল কালাম (৪৫) ও ইমরান (২৫) নামের আরো দুইজন।

উপজেলার গোদাগাড়ী দানাজপুর এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহত রাজু ইসলাম উপজেলার দানাজপুর গ্রামের জয়নাল আবেদীনের ছেলে।

প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, পীরগঞ্জ শহর থেকে মোটরসাইকেলযোগে দানাজপুরে যাচ্ছিলেন রাজু কালাম ও ইমরান। গোদাগাড়ী এলাকায় পৌঁছলে চালক নিয়ন্ত্রণ হারান। এতে মোটরসাইকেলটি গাছের সাথে ধাক্কা খেলে মোটরসাইকেলের আরোহী তিন জন গুরুতর আহত হন।

পরে স্থানীয়রা তাদেরকে উদ্ধার পীরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তৃব্যরত চিকিৎসক রাজু ইসলাম কে মৃত ঘোষণা করেন।

অপরদিকে আবুল কালামের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য দিনাজপুর এম আব্দুর রহিম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

পীরগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ, জাহাঙ্গীর আলম এ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।

বন্যার্তদের ত্রান সামগ্রী মিললো শ্রীমঙ্গল বাজারে

তিমির বনিক, মৌলভীবাজার প্রতিনিধি: মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলায় সম্প্রতি বন্যার্ত দুস্থ মানুষের জন্য ক্রয়কৃত শুকনা খাবার চিড়া, মুড়ি বিতরণ না করে উপজেলা প্রশাসনের ত্রাণ গুদাম থেকে প্রকল্প ব্যস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো. তরিকুল ইসলাম তার মনোনীত অফিসের লোকজন দিয়ে বাজারে বিক্রি করার অভিযোগ উঠেছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে উপজেলা প্রশাসন তৎক্ষনাৎ গরীব দুস্থ মানুষের বিতরণ করার নির্দেশনা থাকা সত্বেও তা অমান্য করে গুদামে মজুদ রেখে চিড়া মুড়ি বিভিন্ন দোকানে বিক্রি করেছে। গত বুধবার (২১ সেপ্টেম্বর) শ্রীমঙ্গলের সেন্টাল রোডের একটি দোকানে গিয়ে চিড়া ও মুড়ি বিক্রির সত্যতা পাওয়া গেছে। তবে দোকান মালিকরা এসব গরীবের ত্রাণ সামগ্রী খাবার ক্রয় করতে চাননি। তারা জোরজবরদস্তি করে রেখে গেছেন। বিক্রি হলে তারা টাকা নিবেন বলে জানিয়ে যায়।

দোকান মালিক নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শর্তে বলেন, আমার দোকানে ৯ বস্তা মুড়ি রেখে গেছে। তবে চিড়া অন্যান্য দোকানে বিক্রি করেছে আমি তা রাখিনি।

উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য উধ্বর্তনের কর্তৃপক্ষের নির্দেশে শুকনা খাবার চিড়া ও মুড়িসহ বিভিন্ন প্রকারের ত্রাণ সামগ্রী কেনা হয়েছিল। তার মধ্যে অধিকাংশই খাবার বিতরণ করা হয়নি। ফলে উপজেলার ত্রাণ গুদামে এসব খাদ্য সামগ্রী পড়ে রয়েছে। তারমধ্যে সিলেট জেলার একটি উপজেলার কিছু ত্রাণ সামগ্রী রয়েছে ত্রাণ গুদামে।

এ বিষয়ে শ্রীমঙ্গল উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো. তরিকুল ইসলাম জানান, যেসব ত্রাণ সামগ্রী বিক্রি করা হয়েছে, সেগুলো আমাদের না, সিলেট জেলার বালাগঞ্জ উপজেলার। আমরা বিক্রি করে তাদেরকে টাকা দিয়েছি। তারমধ্যে চিড়া ৩৫০ কেজি ও মুড়ি ৫০০ কেজি বিক্রি করা হয়েছে। এসব ত্রাণ সামগ্রী বন্যার সময় পাবনা থেকে কিনা হয়েছিল। তবে সরকারি ত্রাণ বিক্রির নিয়ম আছে কি না জানতে চাইলে তিনি মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।  এ নিয়ে গত বৃহস্পতিবার কয়েক বার মুঠোফোনে যোগাযোগ করলেও বিজি আছেন বিভিন্ন রকমের তালবাহানা করেন। আমতা আমতা করে শুধু তিনি বলতে থাকেন মিটিং আছে এ নিয়ে পরে কথা বলবো আর অফিসে আসেন চা পান করতে করতে সব তথ্য দিবো যা যা তথ্য প্রয়োজন কিন্তু অফিসে আসেন।

জানতে চাইলে শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী অফিসার আলী রাজিব মাহমুদ মিঠুন বলেন, আমার জানা মতে দুই বস্তা মুড়ি আছে অন্য একটি উপজেলার। এর বাইরে যদি মাল বিক্রি করে থাকে তাহলে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

মৌলভীবাজার জেলা ত্রাণ ও পূনর্বাসন কর্মকর্তা মোহাম্মদ ছাদু মিয়া জানান, সরকারি কোনো ত্রাণ সামগ্রী বিক্রি করার কোনো রকম নিয়ম নেই। সে কেমনে বিক্রি করে? আমি বুঝতেছি না। বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখছি। আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন সত্যতা পাওয়া গেলে।

রানীশংকৈলে পুকুরে গোসল করতে গিয়ে কিশোরের মৃত্যু

হুমায়ুন কবির (ঠাকুরগাঁও) প্রতিনিধিঃ ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল উপজেলায় গতকাল কাশিপুর পাটাগড়া ডাঙ্গীবস্তি গ্রামে শাকিল মিয়া রনি (১২) নামে এক কিশোরের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। রনি ওই গ্রামের একরামুলের ছেলে। গত বৃহস্পতিবার (২২ সেপ্টেম্বর) শেষ বিকালে বাড়ির পাশের পুকুরে গোসল করতে গিয়ে এঘটনা ঘটেছে।

জানা গেছে, ঘটনারদিন রনি সঙ্গীদের সাথে পুকুরে গোসল করতে গিয়ে গভির পানির নিচে তলিয়ে যায়, অনেক খুঁজাখুঁজি পর না পেয়ে তাৎখনিক রানিশংকৈল ফয়ারসার্ভিসকে খবর দিলে সাথে সাথে ফায়ার সার্ভিসের  স্টেশন অফিসার নাছিম ইকবালের নেতৃত্বে রংপুর ডুবুরি ইউনিটের মাধ্যমে কিশোরর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

এ-বিষয়ে আমাদের সংবাদ প্রতিবেদককে ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন অফিসার নাছিম ইকবাল জানায়, বিকেল ৫ টার সময় আমাদের স্টেশনে খবর আসে ১ কিশোর পানিতে ডুবে নিখোঁজ হয়েছে, খবর পাওয়া মাত্রই ১টি ইউনিট সেখানে উপস্থিত হয়। ড্রেজার মেশিন দিয়ে পুকুরে বালি উত্তলনের ফলে গভিরতা ২৫ – ৩০ ফুটের বেশী থাকায় ডুবুরি ইউনিট ১ঘন্টা প্রচেষ্টার পর কিশোরের মরদেহ উদ্ধার করতে সক্ষম হয়।

পরে সহকারী কমিশনার (ভূমি) ইন্দ্রজিৎ সাহা ও কাশিপুর ইউনিয়ন চেয়ারম্যান বকুলের উপস্থিতিতে ওই কিশোরের মরদেহ তার পরিবারে নিকট হস্তান্তর করা হয়।

কাবুলে মসজিদে হামলায় নিহত ৭, আহত ৪০

আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ দক্ষিন এশিয়ার দেশ আফগানিস্তানে কাবুলের একটি মসজিদের সামনে গতকাল শুক্রবার বোমা বিস্ফোরণে ৭ জন নিহত ও অন্তত ৪০ জন আহত হয়েছেন। শুক্রবার জুমার নামাজের পরপরই ওই বিস্ফোরণ ঘটে। রাজধানী কাবুলের ওয়াজির আকবর খান মসজিদে জুমার নামাজের পর মুসল্লিরা যখন ওই মসজিদ থেকে বের হচ্ছিলেন, তখনই বিস্ফোরণটি ঘটে।

কাবুল পুলিশের পক্ষ থেকে এ বিস্ফোরণের তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।

পুলিশের মুখপাত্র খালিদ জারদান বলেছেন, নামাজের পর লোকজন যখন মসজিদ থেকে বের হচ্ছিলেন, তখন বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। এতে হতাহতের সবাই বেসামরিক।

স্থানীয় একটি হাসপাতালের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বিস্ফোরণে আহত ১৪ জনকে হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়েছে।

প্রসঙ্গত, কাবুলে ওয়াজির আকবর খান মসজিদে জুমার নামাজে আসা মুসল্লিদের টার্গেট করে বোমা হামলার সবশেষ ঘটনা এটি। এই মসজিদ অতীতেও হামলার শিকার হয়েছে। তালেবান ক্ষমতায় আসার আগে ২০২০ সালের জুনে মসজিদটিতে বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। ওই ঘটনায় মসজিদের ইমাম নিহত ও বেশ কয়েকজন মুসল্লি আহত হন। এসব বিস্ফোরণের ঘটনায় প্রায়ই জঙ্গি গোষ্ঠী আইএস দায় স্বীকার করে। তবে শুক্রবারের ঘটনায় কোনো গোষ্ঠী দায় স্বীকার করেনি।

বাঞ্ছারামপুরে সামাজিক সম্প্রীতি সমাবেশ অনুষ্ঠিত

মো.নাছির উদ্দিন, বাঞ্ছারামপুর প্রতিনিধিঃ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর উপজেলায়  আসন্ন শারদীয় দুর্গাপূজা ২০২২ সুষ্ঠু-সুন্দরভাবে উদযাপন এবং সার্বিক নিরাপত্তার পরিকল্পনা নিয়ে উপজেলার ধর্মীয় সম্প্রীতি ও সামাজিক বন্ধনকে সুসংহত করার লক্ষে সকল জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, সকল কর্মকর্তা,আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী, সুশিল সমাজের প্রতিনিধি,ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ, বীরমুক্তিযোদ্ধা, সংবাদিক,ইমাম,শিক্ষক ও বিভিন্ন পূজা মন্ডপের প্রতিনিধিসহ সর্বস্তরের জনগনের সমন্বয়ে সামাজিক -সম্প্রীতি সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (২২ সেপ্টেম্বর) বিকাল ৩ ঘটিকার সময়  উপজেলা প্রশাসনের আয়োজনে ক্যাপ্টেন এবি তাজুল ইসলাম অডিটোরিয়ামে সামাজিক -সম্প্রীতি সমাবেশে প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্হিত ছিলেন,দূর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রনালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ক্যাপ্টেন এবি তাজুল ইসলাম (অব.) এমপি, বাঞ্ছারামপুরে তালিকা অনুযায়ী ৪২টি পূজা মন্ডপ তিনি প্রতিটি পূজা মন্ডপে নগদ ২৫ হাজার টাকা করে অনুদান বিতরণ  করেন, সরকারি অনুদান ৪ লাখ ২০ হাজার টাকা ও নিজস্ব তহবিল থেকে ৬ লাখ ৩০ হাজার টাকা মোট সাড়ে দশ লাখ  টাকা অনুদান দিয়েছেন।

বাঞ্ছারামপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার একি মিত্র চাকমার সভাপতিত্বে এসময় উপস্হিত ছিলেন সাবেক যুগ্ম সচিব ও উপজেলা চেয়ারম্যান বীরমুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল ইসলাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রশাসক মো.শাহগীর আলম,পুলিশ সুপার মো.আনিসুর রহমান।

উক্ত সমাবেশে বক্তারা বলেন বাঞ্ছারামপুরে সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখাসহ সার্বিক আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার লক্ষ্যে সবার আন্তরিক সহায়তা কামনা করা হয়, পাশাপাশি কেউ সামাজিক সম্প্রীতি নষ্ট করার চেষ্টা করলে সর্বোচ্চ শাস্তির ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা প্রদান করা হয়। পুলিশের পক্ষ থেকে প্রতিটি পূজা মণ্ডপ এলাকায় সর্বোচ্চ আইন-শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে।  তবে পূজা মণ্ডপে পুলিশ ও আনসারের পাশাপাশি নিজস্ব স্বেচ্ছাসেবক দিয়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সহ পূজার নিরাপত্তার সার্বিক বিষয়ে প্রয়োজনীয় দিক-নির্দেশনা প্রদান করা হয়। এ ক্ষেত্রে জনপ্রতিনিধি, ধর্মীয় নেতা, শিক্ষক সাংবাদিকগন যার যার অবস্থান থেকে কাজ করতে সকলের প্রতি আহবান জানান।

বাঞ্ছারামপুর উপজেলা সহকারি কমিশনার ভূমি কাজী আতিকুর রহমানের সঞ্চালনায় আরোও উপস্হিত ছিলেন উপজেলা আওয়ামীলীগের সহ-সভাপতি ও উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান সায়েদুল ইসলাম বকুল ভূঁইয়া,পৌর মেয়র তফাজ্বল হোসেন, বাঞ্ছারামপুর উপজেলা পূজা উদযাপন কমিটির সভাপতি সাবেক উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান ও কৃষকলীগের সভাপতি মিন্টু রঞ্জন সাহা, বাঞ্ছারামপুর উপজেলা আওয়ামীলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক একে এম শহিদুল হক বাবুল, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো.কবির হোসেন, দরিকান্দি ইউনিয়ন চেয়ারম্যান মির্জা সফিকুল ইসলাম স্বপন, ছলিমাবাদ ইউনিয়ন চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ, ফরদাবাদ ইউনিয়ন চেয়ারম্যান রাশেদুল ইসলাম, সোনারামপুর ইউনিয়ন চেয়ারম্যান শাহিন মিয়া, সদর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আব্দুর রহিম, বাঞ্ছারামপুর মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ মো. নুরে আলম, উপজেলা শ্রমিকলীগের আহবায়ক সৈয়দ মোহাম্মদ আজিজ, উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি মো.নাছির উদ্দিন নাসিম, সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহুল আমিন টিপু,মো. সেলিম রেজা, সাধারণ সম্পাদক মো.আলাউদ্দিন সরকার, বাঞ্ছারামপুর সরকারি ডিগ্রি কলেজের সাবেক সভাপতি জামাল হায়দার, উপজেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাক, পৌর ছাত্রলীগের মো.হিমেল সরকার, সাধারণ সম্পাদক সামূয়েল আহমেদ, বাঞ্ছারামপুর সরকারি ডিগ্রি কলেজের ছাত্রলীগ সভাপতি মো. মাসুদ রানা, সাধারণ সম্পাদক আশিকুল ইসলাম মাসুদ প্রমূখ।

জানা গেছে, এ বছর বাঞ্ছারামপুর উপজেলায় ৪২টি পূজা মন্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে।

বিষ খাইয়ে দুইশ হাঁস মেরে ফেলার অভিযোগ

তিমির বনিক, মৌলভীবাজার প্রতিনিধি: মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলায় খাবারের সাথে বিষ মিশিয়ে খামারের ২০০টি হাঁস মেরে ফেলার অভিযোগ পাওয়া গেছে। ঘটনাটি বৃহস্পতিবার ২২ সেপ্টেম্বর উপজেলার সদর ইউনিয়ন জায়ফরনগরের নয়াগ্রামে ঘটে। এ ঘটনায় প্রায় ২ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন খামারী রাজু আহমেদ (২৮)। তিনি এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার ও ক্ষতিপূরণ দাবি করেছেন।

জানা যায়, খামার মালিক রাজু আহমেদ বাড়ির পাশেই দশ বছর ধরে হাঁসের খামার করে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে জীবিকা নির্বাহ করে আসছিলেন। প্রায় ছয় মাস আগে ৫০০ হাঁসের বাচ্চা নিয়ে তিনি খামার শুরু করেন। ১দিন বয়সের হাঁসের বাচ্ছা কিনে ৬ মাস লালন পালনে তার খরচ দাড়ায় প্রায় সাড়ে তিন লাখ টাকা। বৃহস্পতিবার দিন খামারের পাশের জমিতে ধানের সাথে বিষ মিশিয়ে কে বা কারা প্রায় ২শত হাঁস মেরে ফেলেছে। ২ শত হাঁস হারিয়ে তিনি এখন পথে বসেছেন।

খামারের মালিক রাজু আহমেদ অভিযোগ করে বলেন, আমার পাশের খামারী উপজেলার বাছিরপুর গ্রামের আবুল হোসেনের ছেলে লিটন মিয়া প্রায় সময় আমার হাঁস চুরি করে নিয়ে যায়। এ নিয়ে আশেপাশের মানুষজন বেশ কয়েকবার গ্ৰাম্য মুরব্বিদের নিয়ে বিচারও করেছেন। গতকাল হাঁসের খামার নিয়ে তার সাথে আমার কথা কাটাকাটি হয়েছে। লিটন মিয়া এই আমার এ ক্ষতি করতে পারে। আমি পুলিশের কাছে এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার ও ক্ষতি পূরন দাবি করছি।

অভিযোগের বিষয়ে লিটন মিয়া জানান, এ ঘটনার সাথে আমি জড়িত নই। তবে পাশের খামারী হিসেবে এখন পর্যন্ত ঘটনা দেখতে গেছেন কিনা প্রশ্ন করলে তিনি কোন সদুত্তর দিতে পারেনি।

এলাকাবাসীর ও সন্দেহের তীর লিটন মিয়ার দিকে।

সদর ইউপি জায়ফরনগর চেয়ারম্যান হাজী মাসুম রেজা বলেন, বিষ টোপ দিয়ে হাঁস নিধনের ঘটনা নতুন নয়। তিনি এই ঘটনার নিন্দা জানিয়ে জড়িতদের গ্রেপ্তার করে শাস্তির দাবি জানান।

এঘটনায় নিন্দা জানিয়ে স্থানীয় ইউপি সদস্য মনিরুল ইসলাম বলেন, মানুষের সাথে মানুষের শত্রুতা থাকতে পারে। তাই বলে হাঁস মেরে প্রতিশোধ নিতে হবে? এ কেমন নিষ্ঠুরতা! এ ঘটনার সুষ্ঠ বিচারের দাবি জানান ।

এ বিষয়ে জুড়ী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সঞ্জয় চক্রবর্তী বলেন, ঘটনার খবর পেয়ে সাথে সাথে এসআই সৈয়দ আব্দুল মান্নানের নেতৃত্বে পুলিশের একটি দলকে ঘটনাস্থলে পাঠিয়েছি। তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে আশ্বস্ত করেন।

ঠাকুরগাঁওয়ে অনুষ্ঠিত হলো গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী কবিগান

ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধিঃ ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার মোহাম্মদপুর ইউনিয়নের ফেরসাডাঙ্গী বাজারে গত বুধবার ২১ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হয়ে গেলো উত্তরবঙ্গের ব্যাপক জনপ্রিয় ও ঐতিহ্যবাহী কবিগানের পালা। শালি- দুলাভাইয়ের এই পালা কবিগান শুনতে বিভিন্ন এলাকা থেকে হাজার হাজার শ্রোতার আগমন ঘটে ফেসাডাঙ্গী বাজারে।

উত্তরবঙ্গের মানবকল্যাণ কবি আর সংঘ এ কবি গানের আয়োজনে কবিগানে পুরুষ ও মহিলা কবিয়াল হিসাবে শালী দুলাভাইয়ের ভূমিকায় অংশ নেন উত্তরবঙ্গের জনপ্রিয় কবিয়াল মালতি রানী সরকার ও ক্ষিতীশ চন্দ্র সরকার। মোহাম্মদপুরসহ আশপাশের জেলা থেকে অসংখ্য শ্রোতা আসেন এ কবি গান শুনতে।

অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন, সদর উপজেলার মোহাম্মদপুর ইউনিয়নের ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সোহাগ হোসেন।

মাঠের মাঝখানে বানানো মঞ্চে দুই কবিয়ালের বাক-বিতন্ডা আর তর্ক-বিতর্কের যুদ্ধ চলে গভীর রাত পর্যন্ত। মন্ত্র-মুগ্ধের মতো দর্শকদের নির্ঘুম রাত কাটে।

এক সময়ে কবি ক্ষিতীশ রায় সরকারের গান মন্ত্র-মুগ্ধের মতো শুনতেন এ অঞ্চলের শ্রোতারা।এ এলাকার মানুষের বিনোদনের একটি বড় মাধ্যম ছিল কবি, জারি, সারি গান। তার মধ্যে কবি গান ছিল অন্যতম। কালের বিবর্তনে এবং আধুনিকতার বেড়াজালে পড়ে এসব গানের শ্রোতা একদিকে যেমন কমে গেছে, তেমনি গায়কও কমে গেছে।

এ অঞ্চলে কবি গান প্রায় বিলুপ্তির পথে কিন্তু, শিকড় সন্ধানী কিছু মানুষ এখনও এ কবি গানকে খুঁজে বেড়ান মনের অজান্তে। রাতে আলো-আধারে কবিয়ালদের তাত্ত্বিক যুক্তি-তর্ক শুনতে জড়ো হন হাজারো নারী-পুরুষ। প্রখ্যাত এই দুই কবিয়ালের কবিগান শুনতে ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার মোহাম্মদপুর ইউনিয়নসহ আশপাশের জেলা থেকে বিপুল সংখ্যক শ্রোতা উপস্থিত হন।

অনেকেই আবার প্রথমবারের মত কবিগান শুনতে হাজির হন। তারা আগামীতেও এ ধরনের কবি গানের আয়োজন করবেন বলে আশা ব্যাক্ত করেন।

মোহাম্মদপুর ইউনিয়ন ফেরসাডাঙ্গি হাট কমিটির সভাপতি, ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সোহাগ হোসেন  জানান, প্রাচীন এ ঐতিহ্য ও সম্প্রীতির বন্ধন ধরে রাখতে আগামীতে কবি গানের আয়োজন করা হবে।

হিজাব ইস্যুতে ইরানে চলমান বিক্ষোভে নিহত বেড়ে ৫০

আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ ইরানে পোশাকবিধি না মানায় আটক নারীর মৃত্যুর প্রতিবাদে চলমান বিক্ষোভে বিক্ষোভকারীদের ওপর পুলিশের চালানো গুলিতে নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫০ জন। অন্যদিকে বিক্ষোভকারীদের রোষের মুখে পড়ে নিহত হয়েছে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ৫ সদস্য।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া যাচাইকৃত ফুটেজে দেখা গেছে, সরকার-সমর্থিত সমাবেশ অনুষ্ঠিত হওয়ার কয়েক ঘণ্টা পরেই শুক্রবার সন্ধ্যায় রাজধানী তেহরানের বেশ কয়েকটি এলাকায় বিক্ষোভকারীরা জড়ো হয়। কেউ কেউ সশস্ত্র দাঙ্গা পুলিশের মুখোমুখি হয়েছে। বিক্ষোভকারীদের জমায়েতকে বাধাগ্রস্ত করতে এবং বহির্বিশ্বে প্রতিক্রিয়া প্রকাশ বন্ধ করার জন্য ইন্টারনেট ব্যবহারের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে ইরান।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া যাচাইকৃত ফুটেজে দেখা গেছে, সরকার-সমর্থিত সমাবেশ অনুষ্ঠিত হওয়ার কয়েক ঘণ্টা পরেই শুক্রবার সন্ধ্যায় রাজধানী তেহরানের বেশ কয়েকটি এলাকায় বিক্ষোভকারীরা জড়ো হয়। কেউ কেউ সশস্ত্র দাঙ্গা পুলিশের মুখোমুখি হয়েছে।  বিক্ষোভকারীদের জমায়েতকে বাধাগ্রস্ত করতে এবং বহির্বিশ্বে প্রতিক্রিয়া প্রকাশ বন্ধ করার জন্য ইন্টারনেট ব্যবহারের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে ইরান।

অসলো ভিত্তিক সংস্থা ইরান হিউম্যান রাইটস (আইএইচআর) জানায়, সরকারবিরোধী বিক্ষোভে নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে আট দিনে অন্তত ৫০ জন নিহত হয়েছে; যা সরকারি হিসাবে নিহতের সংখ্যা ১৭ জনের তিনগুণ। এর মধ্যে পাঁচজন নিরাপত্তাকর্মী রয়েছে।

আইএইচআর বলছে, পুলিশি হেফাজতে মাহসা আমিনির মৃত্যুতে শুরু হওয়া এই সহিংসতা ইতোমধ্যে ৮০টি শহরে ছড়িয়ে পড়েছে। তেহরানের নীতি পুলিশ হাতে আটক হওয়ার পর ২২ বছর বয়সী ওই কুর্দি তরুণী ৩ দিন কোমায় ছিলেন।

ইরান সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, এখন পর্যন্ত সরকার বিরোধী বিক্ষোভ সামাল দেয়ার সময় পুলিশের গুলিতে ১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু সরকারের দেওয়া তথ্য ভুয়া বলে অভিযোগ উঠেছে।

সম্প্রতি, সঠিকভাবে হিজাব না পরার কারণে মাশা আমিনিকে (২২) আটক করে ইরানের নৈতিকতা পুলিশ ‘গাশত-ই এরশাদ’। এরপরই তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। গত শুক্রবার (১৬ সেপ্টেম্বর) হাসপাতালের চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান।এ ঘটনায় গত শনিবার থেকে ইরানের পশ্চিমাঞ্চলে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়। মাশা আমিনিকে পুলিশি হেফাজতে মারধর করার অভিযোগ করেন বিক্ষোভকারীরা।

মৌলভীবাজারে এক হাজার হাতে প্রতিমা

তিমির বনিক, মৌলভীবাজার প্রতিনিধি: মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার কাদিপুরে রয়েছে দেশের অন্যতম দর্শনীয় সুন্দর ও আকর্ষণীয় মন্দির। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে মন্দিরটি কাদিপুর-শিববাড়ি নামে পরিচিত। এবারের দুর্গাপূজায় এ মন্দিরের আকর্ষণ থাকছে এক হাজার হাতের প্রতিমা মূর্ত। চারবছর ধরে তৈরি করা এ প্রতিমার কাজ শেষ পর্যায়ে। এখন চলছে রঙের কাজ।

শিববাড়ি মন্দিরের অপরুপ সৌন্দর্য্য ও আশপাশের প্রাকৃতিক দৃশ্য খুব সহজেই পর্যটকদের মন কেড়ে নেয়। অত্যাধুনিক মনোমুগ্ধকর এই মন্দির পূণ্যার্থীদের কাছে একটি তীর্থ স্থান হিসেবে বিবেচিত। যা দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্যশৈলীর শৈল্পিকতায় মুগ্ধ করে পূণ্যার্থীসহ আগতদের।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নয়নাভিরাম নানা কারুকাজ ও শৈল্পিক শৈল্পিকতার তুলির আঁচড় আর চারপাশের নৈসর্গিক প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের নিদর্শন শিববাড়ি মন্দির। দুর্গাপূজা এলেই এখানে দেশ-বিদেশের নানা প্রান্ত থেকে আসেন দর্শনার্থীরা। তবে দুর্গাপূজা ছাড়াও বছর জুড়ে শিববাড়িতে মনস্কামনা পূরণে আসেন দুর দূরান্তের ভক্তরা।

মন্দিরটির রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রধান পুজারি দায়িত্বে থাকা আচার্য পুলক সোম বলেন, সহস্রভুজা (এক হাজার হাত) দেবীদুর্গার প্রতিমা নির্মাণ শুরু হয় ২০১৮ সালে নভেম্বর মাসে। কিন্তু করোনাকালে বৈশ্বিক মহামারীতে কাজের ধীরগতি থাকায় নির্মাণ কাজ বিলম্ব হয়। ২০ জন নির্মাণ শিল্পীর হাতের ছোঁয়ার চার বছর ধরে তৈরি করা হচ্ছে প্রতিমাটি। গত মাসে প্রতিমার কাজ প্রায় শেষ হয়েছে। এ প্রতিমা নির্মাণে পাথর, সিমেন্ট, রড ও বালু ব্যবহার করা হয়।

তিনি আরও বলেন, ১লা অক্টোবর মহাষষ্ঠীর পূর্বেই আনুষঙ্গিক সব কাজ শেষ হবে। পাথরের তৈরি প্রায় ২৩ ফুট উঁচু তপ্তকাঞ্চন বর্ণের সহস্রভুজা প্রতিমায় এখন রঙের কাজ চলছে। মহাষষ্ঠীর দিন দুর্গাপূজার মূল আচার অনুষ্ঠান শুরু হবে।

পুণ্যার্থীরা জানান, এই মন্দিরে পুজার সময় এসে হাজারো মানুষের সাথে দেবীর দর্শন করাটাও আমরা সৌভাগ্য মনে করি। পূজার সময় ভক্তদের ভিড়ে মুখর হয়ে উঠে ঐতিহাসিক অনিন্দ্যসুন্দর এ মন্দিরটি। সারাবছর পুণ্যার্থীদের আগমন থাকেই। তবে এবার একহাজার হাতের প্রতিমা দর্শন করতে প্রতিবারের চাইতেও এবার বেশি পুণ্যার্থীদের আগমন হতে পারে বলে ধারনা করছেন।

উল্লেখ্যঃ মৌলভীবাজার জেলায় এবার ১০০৭ টি মন্ডপে পূজা অনুষ্ঠিত হবে। এবারের পূজায় সাত শতাধিক পুলিশ তিন স্তরে মোতায়েন  থাকবে। এছাড়া প্রায় সাড়ে ছয় হাজার আনসার মোতায়েনের পাশাপাশি বিভিন্ন পর্যায়ের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী থাকবে বলে জেলা আইন-শৃঙ্খলা সভায় সিদ্ধান্ত হয়।

জাতিসংঘের ৭৭তম অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া পূর্ণাঙ্গ ভাষণ

জাতীয় ডেস্কঃ বাংলাদেশ সময় আজ শনিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) ভোরে (স্থানীয় সময় শুক্রবার বিকেলে) প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৭৭তম অধিবেশনে ভাষণ দিয়েছেন। ভাষণে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের পাশাপাশি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের পূর্ণ বিবরণ পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো-


‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম

মাননীয় সভাপতি,

আসসালামু আলাইকুম এবং শুভ অপরাহ্ন।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭৭তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হওয়ায় আপনাকে আন্তরিক অভিনন্দন জানাচ্ছি। আমি আশ্বাস দিচ্ছি, সাধারণ পরিষদের পুরো অধিবেশন জুড়েই আমার প্রতিনিধি দল আপনাকে পূর্ণাঙ্গ সহযোগিতা দিয়ে যাবে। একইসঙ্গে আপনার পূর্বসূরি জনাব আবদুল্লাহ শহীদকেও অভিনন্দন জানাই। জাতিসংঘ মহাসচিব জনাব আন্তোনিও গুতেরেসকে আমি সাধুবাদ জানাই জাতিসংঘকে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে আরও প্রাণবন্ত করে তোলার লক্ষ্যে তাঁর দৃঢ় প্রতিশ্রুতির জন্য।

এ বছরের সাধারণ বিতর্কের প্রতিপাদ্য: ‘একটি সঙ্কটপূর্ণ সন্ধিক্ষণ: আন্তঃসংযুক্ত প্রতিকূলতাসমূহের রূপান্তরমূলক সমাধান।’ জলবায়ু পরিবর্তন, সহিংসতা ও সংঘাত, কোভিড-১৯ মহামারির মত একাধিক জটিল এবং বহুমাত্রিক প্রতিকূলতায় পৃথিবী নামক আমাদের এই গ্রহ আজ জর্জরিত। এবারের প্রতিপাদ্যটি এ সকল প্রতিকূলতা মোকাবিলায় এবং আমাদের অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করে শান্তিপূর্ণ ও টেকসই পৃথিবী গড়ে তোলার উপায় খুঁজে বের করার জন্য সকলের ঐক্যবদ্ধ আকাঙ্খার প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। আর এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য আমাদের এখনই সম্মিলিত উদ্যোগ নিতে হবে।

জনাব সভাপতি,

গত আড়াই বছরেরও বেশি সময় ধরে করোনাভাইরাসের মহামারির মারাত্মক প্রভাব বিশ্ব যখন সামলে উঠতে শুরু করেছে, তখনই রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত বিশ্বকে নতুন করে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা, জ্বালানি এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনের ক্ষেত্রে সহায়তা-প্রার্থী ঝঁকিপূর্ণ দেশগুলো এখন আরও প্রতিকূলতার মুখে পড়েছে। বর্তমানে আমরা এমন একটি সঙ্কটময় সময় অতিক্রম করছি, যখন অতীতের যেকোন সময়ের চেয়ে অধিক পারস্পরিক সংহতি প্রদর্শন করা আবশ্যক।

আমাদের প্রমাণ করতে হবে যে, সঙ্কটের মুহূর্তে বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার মূল ভিত্তি হলো জাতিসংঘ। তাই, সর্বস্তরের জনগণের বিশ্বাস ও আস্থা অর্জনের জন্য জাতিসংঘকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে সকলের প্রত্যাশা পূরণে কাজ করতে হবে।

যুদ্ধ বা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, পাল্টা-নিষেধাজ্ঞার মত বৈরীপন্থা কখনও কোন জাতির মঙ্গল বয়ে আনতে পারে না। পারস্পরিক আলাপ-আলোচনাই সঙ্কট ও বিরোধ নিষ্পত্তির সর্বোত্তম উপায়।

এই পরিপ্রেক্ষিতে, ‘গ্লোবাল ক্রাইসিস রেসপন্স গ্রুপ’ গঠন করায় জাতিসংঘের মহাসচিবকে আমি ধন্যবাদ জানাই। এই গ্রুপের একজন চ্যাম্পিয়ন হিসেবে, আমি বর্তমান পরিস্থিতির গুরুত্ব ও সঙ্কটের গভীরতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি বৈশ্বিক সমাধান নিরূপণ করতে অন্যান্য বিশ্ব নেতাদের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছি।

জনাব সভাপতি,

বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রণীত পররাষ্ট্রনীতির মূল প্রতিপাদ্য হচ্ছে “সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে বৈরীতা নয়”। বাংলাদেশ জন্মলগ্ন থেকেই এই প্রতিপাদ্য-উদ্ভূত জোটনিরপেক্ষ নীতি অনুসরণ করে আসছে। ১৯৭৪ সালের ২৫-এ সেপ্টেম্বর এই মহান পরিষদে তিনি তাঁর প্রথম ভাষণে বলেছিলেন: কোট “শান্তির প্রতি যে আমাদের পূর্ণ আনুগত্য তা এই উপলব্ধি থেকে জন্মেছে যে, একমাত্র শান্তিপূর্ণ পরিবেশেই আমরা আমাদের কষ্টার্জিত জাতীয় স্বাধীনতার ফল আস্বাদন করতে পারবো এবং ক্ষুধা, দারিদ্র্য, রোগ-শোক, অশিক্ষা ও বেকারত্বের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করার জন্য আমাদের সকল সম্পদ ও শক্তি নিয়োগ করতে সক্ষম হবো।

সুতরাং আমরা স্বাগত জানাই সেই সকল প্রচেষ্টাকে, যার লক্ষ্য বিশ্বে উত্তেজনা হ্রাস করা, অস্ত্র প্রতিযোগিতা সীমিত করা, এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকাসহ পৃথিবীর প্রত্যেকটি স্থানে শান্তিপূর্ণ সহ-অবস্থান নীতি জোরদার করা।” আনকোট।

বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের এই বক্তব্য এখনও সমভাবে প্রাসঙ্গিক। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বিশ্বাস করতেন যে, শান্তি হলো বিশ্বের সকল নারী-পুরুষের আশা-আকাক্সক্ষার বাস্তব প্রতিরূপ। যুদ্ধের ফলে মানবজাতি, বিশেষ করে শিশু ও নারীরা চরম কষ্ট ভোগ করে। কত মানুষ রিফিউজি হয়ে পড়ে।

সভাপতি মহোদয়,

বাংলাদেশে কোভিড-১৯ মহামারির শুরু থেকে এ সঙ্কট মোকাবেলায় আমরা মূলত তিনটি বিষয়ের দিকে লক্ষ্য রেখে কৌশল নির্ধারণ করেছি।

প্রথমত, মহামারি সংক্রমণ ও বিস্তাররোধ করতে আমরা জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা প্রসারিত করেছি;

দ্বিতীয়ত, আমাদের অর্থনীতিকে সুরক্ষিত রাখতে কৌশলগত আর্থিক প্রণোদনা প্রদান করেছি; এবং তৃতীয়ত, আমরা জনগণের জীবিকা সুরক্ষিত রেখেছি। এসব উদ্যোগ মহামারিজনিত মৃত্যুর সংখ্যা হ্রাস করার পাশাপাশি মানুষের দুর্ভোগ কমাতে সাহায্য করেছে।

মহামারি থেকে আমাদের নিরাপদ উত্তরণের মূল চাবিকাঠি হলো টিকা। এই টিকা সরবরাহের জন্য আমরা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও এর কোভ্যাক্স ব্যবস্থা এবং আমাদের সহযোগী দেশগুলোকে ধন্যবাদ জানাই। ২০২২ সালের আগস্ট পর্যন্ত, বাংলাদেশে টিকা পাওয়ার যোগ্য শতভাগ মানুষকে আমরা টিকা দিয়েছি।

জনাব সভাপতি,

একটি টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সবার জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক শান্তিপূর্ণ সমাজ এবং সামাজিক সম্প্রীতি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আমরা কাজ করে যাচ্ছি।

বাংলাদেশ এখন বিশ্বের দ্রুত বর্ধনশীল পাঁচটি অর্থনীতির মধ্যে অন্যতম।

জিডিপির হিসাবে আমাদের অবস্থান ৪১তম। বিগত এক দশকে আমরা দারিদ্র্যের হার ৪১ শতাংশ থেকে ২০.৫ শতাংশে নামিয়ে এনেছি। আমাদের মাথাপিছু আয় মাত্র এক দশকে তিনগুণ বৃদ্ধি পেয়ে ২,৮২৪ মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে।

কোভিড-১৯-এর প্রাদুর্ভাবের পূর্বে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে আমাদের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক এক পাঁচ শতাংশ। এর আগে, আমরা টানা তিন বছর ৭ শতাংশের বেশি জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছি। মহামারি চলাকালেও ২০২০-২১ অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনীতি ৬ দশমিক নয় চার শতাংশ হারে প্রসারিত হয়েছে।

ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ এবং অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও পাল্টা নিষেধাজ্ঞার ফলে সরবরাহ ব্যবস্থায় ব্যাঘাত এবং জ্বালানি, খাদ্যসহ নানা ভোগ্যপণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি পেয়েছে। এ কারণে আমাদের মত অর্থনীতি মারাত্মক চাপের মুখে পড়েছে। মুল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পেয়েছে। এ অবস্থা কাটিয়ে ওঠার জন্য আমরা বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করছি।

২০২৬ সালে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ হতে উন্নয়নশীল দেশে উত্তীর্ণ হতে যাচ্ছে। আমরা ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি জ্ঞানভিত্তিক উন্নত দেশে রূপান্তরিত করার জন্য এবং ২১০০ সালের মধ্যে একটি সমৃদ্ধ ও জলবায়ু-সহিষ্ণু বদ্বীপে উন্নীত করার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছি।

সভাপতি মহোদয়,

সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা, খাদ্য নিরাপত্তা, মা ও শিশু মৃত্যু হ্রাস, লিঙ্গ বৈষম্য, নারীর ক্ষমতায়ন ইত্যাদি ক্ষেত্রে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। গত এক দশকে সাক্ষরতার হার ৫০ শতাংশ থেকে ৭৫ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। আমরা তথ্যপ্রযুক্তি নির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিতকরণের ওপর অধিক গুরুত্বারোপ করেছি।

আমাদের শিশুমৃত্যুর হার প্রতি হাজারে ২১ জনে এবং প্রতি লাখ জীবিত জন্মে মাতৃমৃত্যু হার ১৭৩ জনে নেমে এসেছে। মানুষের গড় আয়ু এখন ৭৩ বছরের অধিক।

আমরা সমাজের সবচেয়ে দুর্বল ব্যক্তিদের প্রতি বিশেষ মনযোগ দিয়েছি যাতে সমাজের কেউ পিছিয়ে না থাকে। স্বামী-পরিত্যাক্তা নারী, বিধবা, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, তৃতীয় লিঙ্গ এবং অন্যান্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠির সামাজিক ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বিদ্যমান সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতা বাড়ানো হয়েছে। বর্তমানে প্রায় ১ কোটি ৭০ লাখ মানুষ সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় উপকৃত হচ্ছেন।

উন্নত ভৌত অবকাঠামো মজবুত অর্থনৈতিক কাঠামোর ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। এজন্য আমরা নদীর তলদেশের টানেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে এবং ম্যাস র‌্যাপিড ট্রানজিট সিস্টেমসহ টেকসই বৃহৎ অবকাঠামো নির্মাণ করছি। আমাদের সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থায় সম্প্রতি যুক্ত হয়েছে আমাদের নিজস্ব অর্থায়নে নির্মিত “পদ্মা বহুমুখী সেতু”। এটি বাংলাদেশের স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকে সহজতর করবে এবং আঞ্চলিক যোগাযোগ বৃদ্ধি করবে। এই সেতু জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে ১ দশমিক দুই-তিন শতাংশ হারে অবদান রাখবে।

জনাব সভাপতি,

মানবজাতির জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হলো জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রভাব। জলবায়ু নিয়ে প্রতিশ্রুতি দেওয়া আর ভাঙার একটি দুষ্টচক্র আমরা অতীতে দেখেছি। আমাদের এখনই এই অবস্থা থেকে বের হয়ে আসতে হবে।

বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় প্যারিস চুক্তি বাস্তবায়নের সঙ্গে এবং টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ঠ অর্জনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ অসংখ্য পদক্ষেপ নিয়েছে। ক্লাইমেট ভালনারেবল ফোরামের সভাপতি থাকাকালে আমরা ‘মুজিব ক্লাইমেট প্রস্পারিটি প্লান’ গ্রহণ করি, যার লক্ষ্য হলো বাংলাদেশকে “ঝুঁকির পথ থেকে জলবায়ু সহনশীলতা ও জলবায়ু সমৃদ্ধির টেকসই পথের” দিকে নিয়ে যাওয়া।

জলবায়ু পরিবর্তন এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ সম্পর্কিত আমাদের জাতীয় পরিকল্পনা এবং নীতিগুলো জেন্ডার সংবেদনশীল করে তৈরি করা হয়েছে।

ঝুঁকিতে থাকা অন্যান্য দেশগুলোকে তাদের নিজস্ব জলবায়ু সমৃদ্ধি পরিকল্পনা প্রণয়ণে সহায়তা করতে আমরা প্রস্তুত আছি। অন্তর্ভুক্তিমূলক জলবায়ু কার্যক্রমের প্রসারের জন্য আমি বিশ্ব নেতৃবৃন্দকে আহ্বান জানাই।

সভাপতি মহোদয়,

অভিবাসীরা এখনও তাদের অভিবাসন যাত্রায় অনিশ্চিত পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছেন। তারা তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ ঘটাতে আমাদের অবশ্যই বিশ্বব্যাপী অংশীদারিত্ব এবং সংহতি বাড়াতে হবে। এ বিষয়ে ‘গ্লোবাল কমপ্যাক্ট অন মাইগ্রেশন’ এবং এর “অগ্রগতি ঘোষণা” আমাদের এ বিষয়ে একটি চমৎকার রোডম্যাপ দিয়েছে।

বর্তমানে, এসব জটিল বৈশ্বিক সঙ্কট অনেক উন্নয়নশীল দেশের বিগত কয়েক দশকের উন্নয়ন অগ্রযাত্রাকে স্থবির করে দিচ্ছে। এই মুহূর্তে ২০৩০-এজেন্ডা বাস্তবায়ন করা তাদের অনেকের কাছেই একটি অধরা স্বপ্ন বলে মনে হচ্ছে। তাদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং কৃষিসহ মারাত্মভাবে প্রভাবিত ক্ষেত্রগুলোতে সুনির্দিষ্ট সহায়তা প্রয়োজন। এখন বিজ্ঞান, প্রযুক্তি এবং উদ্ভাবনের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হবে।

আমরা দেখছি, কীভাবে নিত্য-নতুন প্রযুক্তি বিশ্বকে দ্রুত পরিবর্তন করে ফেলছে। এই প্রযুক্তিগুলো ব্যবহারের সকলের ন্যায্য এবং সমান সুযোগ পাওয়া অপরিহার্য। ক্রমবর্ধমান প্রযুক্তিগত বিভাজন অবশ্যই দূর করতে হবে।

বাংলাদেশসহ ১৬টি দেশ এখন স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উন্নীত হওয়ার পথে। তবে ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক সঙ্কট আমাদের টেকসই উত্তরণের পথে গুরুতর প্রতিকূলতা সৃষ্টি করেছে। আমাদের উন্নয়নের অংশীজনদের কাছে বর্ধিত এবং কার্যকর সহযোগিতার আহ্বান জানাই। এ বিষয়ে দোহা কর্মসূচিকে আমরা স্বাগত জানাই।

জনাব সভাপতি,

প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সমুদ্রসীমার শান্তিপূর্ণ নিষ্পত্তির পর সুনীল অর্থনীতি বাংলাদেশের উন্নয়নের নতুন দুয়ার খুলে দিয়েছে।

আমরা আর্থ-সামাজিক উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করতে আমাদের সামুদ্রিক সম্পদের টেকসই ব্যবহার, সংরক্ষণ এবং ব্যবস্থাপনার জন্য বিশ্বব্যাপী অংশীজনদের সঙ্গে একযোগে কাজ করার দৃঢ় ইচ্ছা পোষণ করি।

সামুদ্রিক সম্পদের টেকসই ব্যবস্থাপনার জন্য সমুদ্র আইন সম্পর্কিত জাতিসংঘের কনভেনশনের বিধানগুলির কার্যকর বাস্তবায়ন অপরিহার্য।

এ বিষয়ে যেকোন দুর্বলতা উত্তরণের জন্য ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার এবং জাতীয় এখতিয়ারের বাইরের অঞ্চলে সামুদ্রিক জীববৈচিত্রের সংরক্ষণ ও টেকসই ব্যবহারের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় আন্তর্জাতিক আইন যা “বি বি এন জে” নামে পরিচিত, সেটি প্রণয়নে আরও তৎপর হওয়ার জন্য সদস্য দেশগুলোকে আহ্বান জানাই।

সভাপতি মহোদয়,
পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তাররোধসহ সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণের জন্য আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমরা ২০১৯ সালে পারমাণবিক অস্ত্র নিষিদ্ধকরণ বিষয়ক ঐতিহাসিক চুক্তি অনুস্বাক্ষর করি।

আমরা ধারাবাহিকভাবে শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে আমাদের অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করে আসছি। আমাদের শান্তি-কেন্দ্রিক পররাষ্ট্রনীতির প্রতিফলন হিসেবে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে সৈন্য ও পুলিশ প্রেরণকারী দেশগুলোর মধ্যে আমরা বর্তমানে শীর্ষে অবস্থান করছি।

শান্তিরক্ষাসহ, জাতীয় ও স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি, বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা প্রদান, নারী ও অন্যান্য পিছিয়ে পড়া গোষ্ঠীর ক্ষমতায়নের মাধ্যমে একটি টেকসই সমাজ গঠন করতে এ সকল অঞ্চলের জনগণকে তাঁরা সাহায্য করে যাচ্ছেন। দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আমাদের অনেক শান্তিরক্ষী নিহত হয়েছেন।

আমরা বিশ্বাস করি যে, দ্বন্দ্ব-সংঘাতের মূল কারণগুলোর সমাধান ব্যতিত টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। জাতিসংঘ শান্তি বিনির্মাণ কমিশনের বর্তমান সভাপতি হিসেবে আমরা সংঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে সহযোগিতার উদ্দেশ্যে বহুমাত্রিক অংশীজনদের একসঙ্গে কাজ করার একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরিতে চেষ্টা করে যাচ্ছি। নারী, শিশু, শান্তি ও নিরাপত্তা এজেন্ডাকে আরও শক্তিশালী করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতেও আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

বাংলাদেশে সন্ত্রাস ও সহিংস উগ্রপন্থার বিষয়ে আমরা ‘শূণ্য সহনশীলতা’ নীতি গ্রহণ করেছি। বাংলাদেশের ভূখ-ে কোনোরূপ সন্ত্রাসী কার্যকলাপ বা জনগণের ক্ষতি হয় এমন কোন কর্মকা- সংঘটিত হতে দেই না।

এ ছাড়া সাইবার-অপরাধ এবং সাইবার সহিংসতা মোকাবিলা করার লক্ষ্যে একটি আন্তর্জাতিক বাধ্যতামূলক চুক্তি প্রণয়ণে একসঙ্গে কাজ করার জন্য আমি সদস্য দেশগুলোকে আহ্বান জানাই।

জনাব সভাপতি,

একটি দায়িত্বশীল সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে, বাংলাদেশ তার জনগণের মানবাধিকার সংরক্ষণ ও উন্নয়নে অঙ্গীকারাবদ্ধ। জনগণের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং সামাজিক অধিকার নিশ্চিত করার জন্য আমরা একটি সামগ্রিক এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক পন্থা অবলম্বন করেছি।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আমরা হিজড়া জনগোষ্ঠীর প্রয়োজনীয় অধিকার ও কল্যাণ সাধনের জন্য সংশ্লিষ্ট আইনি বিধি-বিধান প্রণয়ন করেছি।

দেশের সকল ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারের জন্য বিনামূল্যে আবাসন প্রদানের লক্ষ্যে ‘আশ্রয়ণ’ শীর্ষক একটি প্রকল্প আমরা বাস্তবায়ন করছি। ১৯৯৭ সাল থেকে আমার নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলে বিগত ১৮ বছরে প্রায় ৩৫ লাখেরও বেশি মানুষের আবাসনের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

সভাপতি মহোদয়,

অধিকৃত ফিলিস্তিনি জনগণের প্রতি আমাদের সমর্থন অব্যাহত থাকবে। ১৯৬৭ সালের পূর্বের সীমান্তের ভিত্তিতে দ্বি-রাষ্ট্রীয় সমাধান ও রাজধানী হিসেবে পূর্ব জেরুজালেমকে নির্ধারণ করে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রতি বাংলাদেশের দ্ব্যর্থহীন সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করছি।

জনাব সভাপতি,

আমি এখন আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করবো মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর দিকে। গত মাসে ২০১৭ সালে স্বদেশ থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে তাদের গণহারে বাংলাদেশে প্রবেশের পাঁচ বছর পূর্ণ হয়েছে।

রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে নিরাপদে ও মর্যাদার সঙ্গে প্রত্যাবাসনের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরিতে দ্বিপাক্ষিক, ত্রিপাক্ষিক এবং জাতিসংঘসহ অন্যান্য অংশীজনদের নিয়ে আলোচনা সত্ত্বেও একজন রোহিঙ্গাকেও তাদের মাতৃভূমিতে ফেরত পাঠানো যায়নি। মিয়ানমারে চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সশস্ত্র সংঘাত বাস্তচ্যূত রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনকে আরও দুরূহ করে তুলেছে। আশা করি, এ বিষয়ে জাতিসংঘ কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের দীর্ঘায়িত উপস্থিতি বাংলাদেশের অর্থনীতি, পরিবেশ, নিরাপত্তা এবং সামাজিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে। তাদের প্রত্যাবাসনের অনিশ্চয়তা সর্বস্তরে ব্যাপক হতাশার সৃষ্টি করেছে। মানবপাচার ও মাদক চোরাচালানসহ আন্তঃসীমান্ত অপরাধ বৃদ্ধি পাচ্ছে।

এমনকি এ পরিস্থিতি উগ্রবাদকেও ইন্ধন দিতে পারে। এ সঙ্কট প্রলম্বিত হতে থাকলে তা এই উপমহাদেশসহ বৈশ্বিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার ওপর মারাতœক প্রভাব ফেলতে পারে।

জনাব সভাপতি,

কোভিড-১৯ মহামারি হতে আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় শিক্ষণীয় বিষয় হলো ‘যতক্ষণ পর্যন্ত সবাই নিরাপদ নয়, ততক্ষণ পর্যন্ত কেউই নিরাপদ নয়’। এই অভিজ্ঞতার উপর ভিত্তি করে জাতিসংঘসহ আমাদের অন্যান্য প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর বাস্তবিক ও অত্যাবশ্যক সংস্কার করা উচিত যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের বিপর্যয় মোকাবিলার জন্য আরও কার্যকর প্রস্তুতি নেওয়া সম্ভব হয়।

আমরা দারিদ্র্য বিমোচন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব প্রশমন, সংঘাত প্রতিরোধ এবং আর্থিক, বিদ্যুৎ ও জ্বালানী সঙ্কটের মত বৈশ্বিক প্রতিকূলতাগুলোর রূপান্তরমূলক সমাধান খুঁজতে আগ্রহী। তবে আমাদের উপলব্ধি করতে হবে যে, শান্তি ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা ব্যতিত আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন সম্ভব নয়।

আমরা ইউক্রেন ও রাশিয়ার সংঘাতের অবসান চাই। নিষেধাজ্ঞা, পাল্টা-নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে একটি দেশকে শাস্তি দিতে গিয়ে নারী, শিশুসহ ও গোটা মানবজাতিকেই শাস্তি দেওয়া হয়। এর প্রভাব কেবল একটি দেশেই সীমাবদ্ধ থাকে না বরং সকল মানুষের জীবন-জীবিকা মহাসঙ্কটে পতিত হয়। মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়। খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়। বিশেষ করে, শিশুরাই বেশি কষ্ট ভোগ করে। তাদের ভবিষ্যৎ অন্ধকারে হারিয়ে যায়।

বিশ্ব বিবেকের কাছে আমার আবেদন, অস্ত্র প্রতিযোগিতা, যুদ্ধ, স্যাংশন বন্ধ করুন। শিশুকে খাদ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও নিরাপত্তা দিন। শান্তি প্রতিষ্ঠা করুন।

আমরা দেখতে চাই, একটি শান্তিপূর্ণ বিশ্ব- যেখানে থাকবে বর্ধিত সহযোগিতা, সংহতি, পারস্পরিক সমৃদ্ধি এবং ঐকবদ্ধ প্রচেষ্টা। আমাদের একটি মাত্র পৃথিবী এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে এই গ্রহকে আরও সুন্দর করে রেখে যাওয়া আমাদের দায়িত্ব।

জনাব সভাপতি,

এখন আমি এক নিদারুণ ট্রাজেডির কথা বলবো।

১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট আমার পিতা, জাতির পিতা, বাংলাদেশের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। একইসঙ্গে আমার মা ফজিলাতুন নেছা মুজিব, আমার ছোট তিন ভাই – মুক্তিযোদ্ধা ক্যাপ্টেন শেখ কামাল ও তাঁর নবপরিণীতা স্ত্রী সুলতানা কামাল, মুক্তিযোদ্ধা লেফটেন্যান্ট শেখ জামাল, তাঁর নবপরিণীতা স্ত্রী পারভিন রোজী, আমার দশ বছরের ছোট ভাই শেখ রাসেলকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।

আমার চাচা মুক্তিযোদ্ধা শেখ আবু নাসের, ফুফা আবদুর রব সেরনিয়াবাত, তাঁর কন্যা ১৩ বছরের বেবী সেরনিয়াবাত, ১০ বছরের আরিফ সেরনিয়াবাত এবং ৪ বছরের সুকান্ত, আমার ফুফাত ভাই মুক্তিযোদ্ধা শেখ ফজলুল হক মনি ও তাঁর অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আরজু মনি, ব্রিগেডিয়ার জামিল, পুলিশ অফিসার সিদ্দিকুর রহমানসহ ঘাতকেরা ১৮ জন মানুষকে হত্যা করে। আমি তাঁদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করি।

১৯৭৫ সালে ১৫ই আগস্ট জার্মানিতে ছিলাম বলে আমার ছোটবোন শেখ রেহানা ও আমি বেঁচে যাই। ৬ বছর রিফিউজি হিসেবে বিদেশে থাকতে হয়।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশে হানাদার পাকিস্তানী সেনাবাহিনী ত্রিশ লাখ মানুষকে হত্যা করে। দুই লাখ মাবোনের উপর পাশবিক অত্যাচার চালায়। তাদের শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি।

১৯৭১ সালে আমার পিতাকে গ্রেফতার করার পর পাকিস্তানের অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। ঢাকায় আমার মা, দুই ছোটভাই শেখ রাসেল ও শেখ জামাল, ছোটবোন শেখ রেহানা ও আমাকে গ্রেফতার করে একটি একতলা স্যাতসেতে বাড়িতে রাখে। আমার প্রথম সন্তান সজীব ওয়াজেদ জয় ঐ বন্দিখানায় জন্মগ্রহণ করে। আমাদের ঘরে কোন ফার্নিচার দেওয়া হয়নি। সুচিকিৎসার কোন ব্যবস্থা ছিল না। দৈনন্দিন খাবার পাওয়াও ছিল অনিশ্চিত।

কাজেই যুদ্ধের ভয়াবহতা, হত্যা-ক্যু-সংঘাতে মানুষের যে কষ্ট-দুঃখ-দুর্দশা হয়, ভুক্তভোগী হিসেবে আমি তা উপলদ্ধি করতে পারি। তাই যুদ্ধ চাই নে, শান্তি চাই; মানবকল্যাণ চাই। মানুষের অর্থনৈতিক উন্নতি চাই। আগামী প্রজন্মের জন্য শান্তিময় বিশ্ব, উন্নত-সমৃদ্ধ জীবন নিশ্চিত করতে চাই। আমার আকুল আবেদন, যুদ্ধ, অস্ত্র প্রতিযোগিতা বন্ধ করুন। সমুন্নত হোক মানবিক মূল্যবোধ।

আসুন, সবাইকে এক সঙ্গে নিয়ে হাতে হাত মিলিয়ে আমরা একটি উত্তম ভবিষ্যৎ তৈরির পথে এগিয়ে যাই।

সবাইকে ধন্যবাদ।

খোদা হাফেজ।
জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু
বাংলাদেশ চিরজীবী হোক।